সর্বশেষ খবর
Home / ফেনী নদীর পানি বন্টন চুক্তি; ন্যায্য হিস্যা চায় বাংলাদেশ

ফেনী নদীর পানি বন্টন চুক্তি; ন্যায্য হিস্যা চায় বাংলাদেশ

এম . সাইফুল ইসলাম, খাগড়াছড়িঃ

 

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে বৈঠক হয়েছে। স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় বাংলাদেশের ফেনী নদী থেকে পানি প্রত্যাহার করে ত্রিপুরায় নিতে পারবে ভারত। শনিবার (৫ অক্টোবর) দুপুরে নয়াদিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে বৈঠকে বসেন শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদী।

খবরে বলা হয়, স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় ফেনী নদীর ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার করতে পারবে ভারত। এই পানি তারা ত্রিপুরা সাব্রুম শহরে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ প্রকল্পে ব্যবহার করবে। ফেনী নদী অভিন্ন নয়-শুধুই বাংলাদেশের সম্পদ। এর উৎপত্তি, প্রবাহ এবং ভৌগলিক অবস্থান নিশ্চিত করে ফেনী নদী কোনভাবেই আন্তর্জাতিক নদী প্রবাহের সীমা রেখায় প্রবাহিত নয়।

“ফেনী নদীর পানি বন্টন” চুক্তি নিয়ে ইতিমধ্যেই মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা-রামগড় ও ফেনীর ছাগলনাইসহ নদী তীরবর্তী জনসাধারণের মাঝে। দু’দেশের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে ১.৮২ কিউসেক পানি উত্তোলনের উক্ত চুক্তি স্বাক্ষরের পর জনপ্রতিনিধিসহ স্থানীয়দের অনেকেই মনে করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের কল্যাণের জন্য ভেবে চিন্তেই এই চুক্তি করেছেন, কিন্তু স্থানীয় কৃষকরা মনে করছেন চুক্তির আগেই ২০১০ সাল হতে অবৈধ ভাবে নদীর ভারতীয় অভ্যন্তরে অন্তত ৩৪টি স্থানে পাম্পের সাহায্যে ইতিমধ্যেই ভারত আনুমানিক ৩০-৩৫ কিউসেক পানি তুলে নিয়ে যাচ্ছে, ফলশ্রুতিতে নদী তীরবর্তী কৃষকরা শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পরিমান পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আর এতে করে কৃষি কাজ, গবাদি পশুসহ বিভিন্ন ভাবে লোকসানের মুখোমুখি হচ্ছেন তারা।

চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য পানি প্রত্যাহার করে নেয়া হলে শুষ্ক মৌসুমে নদী তীরবর্তী চট্টগ্রামের মিরসরাই, খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা, রামগড় উপজেলা, ফেনীর ছাগলনাইয়া, পরশুরাম, সোনাগাজী, মুহুরী সেচ প্রকল্প, ফুলগাজী, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের দক্ষিণাংশ এবং নোয়াখালী-লক্ষীপুরের কিছু অংশের বিভিন্ন সেচ প্রকল্পে পানির জোগান অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এতে করে লাখ লাখ হেক্টর জমি অনাবাদি হয়ে পড়বে। অকার্যকর হয়ে পড়বে ১৯৮৪ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের হাত ধরে তৎকালীন ১৫৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেচ প্রকল্প “মুহুরী”প্রজেক্ট। যার আওতায় এ অঞ্চলের প্রায় ১৪ থেকে ১৫টি উপজেলার ৮/৯ লাখ হেক্টর জমিতে লোনামুক্ত পানির সরবরাহ করা হয়। যার মাধ্যমে শুধুমাত্র ফেনীর ৬টি উপজেলায় বছরে অতিরিক্ত প্রায় ৮৬ হাজার মেট্টিক টন ফসল উৎপাদন হয়। এ প্রকল্পের আওতায় যেখানে ফেনী, মুহুরী ও কালিদাস পাহালিয়া- এ তিনটি নদীর পানি দিয়ে ৮/৯ লাখ হেক্টর জমির সেচকাজ করার কথা, সেখানে এখনই শুকনো মৌসুমে পানির অভাবে ২৩ হাজার হেক্টর জমিতেও সেচ দেয়া সম্ভব হয় না। মুহুরী সেচ প্রকল্পের প্রায় ৮০ ভাগ পানির মূল উৎস “ফেনী নদী”। ফেনী থেকে ২৫ কিলোমিটার ও চট্টগ্রাম থেকে ৭০ কিলোমিটার এবং সমুদ্র সৈকত থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রাম-ফেনী জেলার সীমানায় মুহুরী সেচ প্রকল্পটির অবস্থান। এখানে গড়ে ওঠা দিগন্ত বিস্তৃত চিংড়ি ঘেরগুলো ধংস হবে। মুহুরী, সিলোনিয়া, পিলাকসহ প্রায় শতাধিক ছোট-বড় নদী, খাল ও ছরায় পানি শূন্যতা দেখা দেবে।

এক দশক আগ থেকেই রামগড় উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ও ছাগলনাইয়া উপজেলার যশপুর খাল, ছাগলনাইয়া ছড়া, ফুলছড়ি খাল, হিছাছড়া,মন্দিয়া খাল,জংগলমিয়া খাল,পান্নাঘাট খালসহ অসংখ্য খালের তলা শুকনো মওসুমে পানির অভাবে ফেটে চৌচির হয়ে যায়। এছাড়া মুহুরী প্রকল্পের নয়নাভিরাম পর্যটন সম্ভাবনা হারিয়ে যাবে নিমিষেই। হুমিকর মুখে পড়বে কয়েক লক্ষ হেক্টর জমির গাছপালা। ফেনী নদী, মুহুরী ও কালিদাশ পাহাড়িয়া নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার মৎস্য খামার বন্ধ হয়ে যাবে। যা থেকে উৎপাদিত মাছ দিয়ে পুরো চট্টগ্রামের ৭০ ভাগ মৎস্য চাহিদা পূরণ করা যায়। বছরে প্রায় আড়াইশ কোটি টাকার মৎস্য উৎপাদন হয় এ প্রকল্পের পানি দিয়ে। নদীর তীরবর্তী ২০-২২ হাজার জেলে পরিবারের জীবন-জীবিকা অন্ধকারের মুখে পড়বে। বিলিন হয়ে যাবে বিরল প্রজাতির মাছ ও পশু-পাখি। সামুদ্রিক লবনাক্ততা বৃদ্ধি পেয়ে ধংস হবে, সবুজ বনায়ন। দেখা দেবে পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্যহীনতা। বেকার হয়ে যাবে লক্ষাধিক কর্মজীবী মানুষ। সব কিছু হারিয়ে ভিক্ষার ঝুলি হাতে নিয়ে পথে বসবে প্রায় ২০ লাখ পরিবার। সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এ অঞ্চলের প্রায় অর্ধকোটিরও বেশী মানুষ।

এছাড়া ফেনী নদীর বালু মহাল ইজারার মাধ্যমে প্রতি বছর সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে। ভারতের সঙ্গে চুক্তি হওয়ায় এ নদীতে পানি সঙ্কটের কারণে বালি উত্তোলন প্রক্রিয়াও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। হুমকির মুখে পড়বে ফেনী ও চট্টগ্রাম জেলার হাজার হাজার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ২০১০ সাল হতে অবৈধ ভাবে নদীর ভারতীয় অভ্যন্তরে অন্তত ৩৪টি স্থানে পাম্পের সাহায্যে পানি তোলাকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকবার বাংলাদেশের পক্ষ হতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে প্রতিবাদ জানিয়ে পানি তোলা হতে বিরত থাকতে বলা হলেও অদ্যাবধি উক্ত ভারী পাম্প মেশিনের সাহায্যে পানি উত্তোলন করে খাগড়াছড়ির রামগড় সীমান্তের সাবরুমে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করছে ভারত। বর্ষাকালে ফেনী নদী ভরা যৌবনা থাকলেও শীত ও গ্রীষ্মকালে এ নদী শুকিয়ে চরে পরিনত হয়। এমতাবস্থায় পানি বন্টন চুক্তিটি স্বাক্ষর হলেও চুক্তির কার্যকারিতা শুরুর আগে ভারত কর্তৃক বর্তমানে অবৈধভাবে তোলা পানির পাম্প উঠিয়ে নেয়া ও  চুক্তি অনুযায়ী ১.৮২ কিউসেকের বেশী পানি উত্তোলনের বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত চান রামগড়বাসী।

এবিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় কৃষকরা জানান, ভারতীয়দের অবৈধভাবে পানি উত্তোলনের ফলে শুষ্ক মৌসুমে পানি পান না তারা, এসময় শাক-সবজিসহ বিভিন্ন ফসালদিতে সেচ দিতে না পারায় ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়তে হয় কৃষকদের। তাছাড়া বর্ষাকালে নদীতে ভরা পানি থাকলেও সেচ কাজে পানি আনতে গেলে কিংবা নদীতে গোসল করতে গেলেও বাঁধা দেয় বিএসএফ।

রামগড় উপজেলা দূর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মোঃ শাহ আলম জানান, নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে অবৈধভাবে পানি তুললেও তার সমাধান না করে নতুন করে পানি বন্টন চুক্তিতে ক্ষতিগ্রস্থ হবে ফেনী নদীর তীরবর্তী কৃষক ও স্থানীয় জনসাধারন। তিনি বলেন, উভয় দেশের আন্তর্জাতিক পানি বন্টনের ন্যায্য হিস্যা হিসাব না করে ভারতের একচেটিয়া পানি উত্তোলনে বাংলাদেশ অংশে পানির স্তর ধীরে ধীরে নীচে নেমে যাচ্ছে এবং উর্বরতা হারাচ্ছে ফসলি জমি। এতে করে ফেনী নদীর তীরবর্তী লোকজনের কৃষিসহ বিভিন্নভাবে জীবনযাত্রায় সূদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে। তাই এ চুক্তিটি বাস্তবায়নের আগে বাংলাদেশী জনগনের নায্য হিস্যাও দাবি করেন তিনি।

দেশের উন্নয়ন ও স্বার্থ রক্ষা করেই প্রধানমন্ত্রী ভারতকে ফেনী নদীর পানি উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছেন মন্তব্য করে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বিশ্ব প্রদিপ কারবারী বলেন, “অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী আমাদের অধিকার সমুন্নত রেখেই পানি বন্টন চুক্তি করেছেন”। এছাড়া চুক্তি ব্যতিরিকে ভারত যাতে অতিরিক্ত পানি নিতে পারে সেদিকেও খেয়াল রাখতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।

এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলতে চাইলে খাগড়াছড়ি পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী নিখিল চাকমা বলেন, ভারতকে পানি দেওয়ার বিষয়টি একটি উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত। সরকার অবশ্যই দেশের স্বার্থ অক্ষুন রেখেই চুক্তিটি করেছে। এছাড়া ভারতীয়দের অবৈধভাবে পানি উত্তোলনের বিষয়ে তিনি বলেন, কিছুদিন পূর্বে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অভিযোগের ভিত্তিতে ফেনী নদীর উক্ত স্থানগুলো পরিদর্শন করেছে ভারতের একটি দল, তবে জনবল সংকটের কারণে পানি উন্নয়ন বোর্ড বিষয়গুলোর সঠিক তদারকি করতে পারছেন না বলেও জানান তিনি।

উল্লেখ্য, এক পাশে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির রামগড় ও চট্টগ্রামের মিরসরাই, আরেক পাশে ফেনীর ছাগলনাইয়া। মাঝে কল কল ধ্বনিতে ধেয়ে চলছে ফেনী নদী। খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা ও পানছড়ির মধ্যবর্তী “ভগবান” টিলা থেকে ছড়া নেমে আসে ভাটির দিকে। আর আসালং-তাইন্দং দ্বীপ থেকে রূপ নেয় ফেনী নদী নামে। ভগবানটিলার পর আসালং তাইন্দং এসে প্রাকৃতিকভাবে প্রবাহিত ছড়াকে কেটে ভারতের ভেতরে প্রবেশ করানো হয়েছে। আসালং তাইন্দং থেকে নেমে আসা ছড়া আমলীঘাটের এখানটাতেই ছাগলনাইয়া ছুয়ে ফেনী নদী নামে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিলেছে।

শেয়ার করুন

About admin

01580-242555

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*