সর্বশেষ খবর
Home / খাগড়াছড়ি / নিজেদের জীবন বাজি রেখে উপজাতি যুবকের জীবন বাঁচালো নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরা

নিজেদের জীবন বাজি রেখে উপজাতি যুবকের জীবন বাঁচালো নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরা

নিউজ ডেস্ক

পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তাব্যবস্থা সমুন্নত রেখেও প্রায়শই দুর্গম পাহাড়ে বসবাসরত পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, চিকিৎসা সেবাসহ নানা জীবন সংগ্রামে অবদান রেখে চলেছে নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরা। এমনকি নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি প্রসুতি মায়ের প্রসব বেদনায় হেলিকপ্টার যোগে তাদের চট্টগ্রাম নিয়ে প্রসুতি মা ও সদ্যজাত সন্তানের জীবন বাঁচানো, ভাল্লুকের কামড়ে গুরুতর আহত কিশোরকে হেলিকপ্টার যোগে চট্টগ্রাম নিয়ে চিকিৎসা সেবা দিয়ে মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরিয়ে আনাসহ হামে আক্রান্ত ৫ নিষ্পাপ শিশুকেও হেলিকপ্টার যোগে নিয়ে গিয়ে নিজেদের খরচে উন্নত চিকিৎসা দিয়ে তাদের মা-বাবার কাছে ফিরিয়ে দেয়া যেন নিরাপত্তাবাহিনীর নিত্য কাজে পরিণত হয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় রাঙামাটির সাজেক ইউনিয়নের জপুই পাড়া থেকে এবার যতীন ত্রিপুরা (৩৩) নামে এক যুবককে উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টার যোগে চট্টগ্রাম নিয়ে এসে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে নিরাপত্তাবাহিনী।  রোববার (০৩ মে) বিকেল সাড়ে ৪টায় তাকে চট্টগ্রাম নিয়ে আসা হয়। এসময় উক্ত এলাকায় প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টির আশঙ্কাসহ আবহাওয়া প্রতিকূল জেনেও নিজেদের জীবন হুমকিতে ফেলে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার যোগে আহত উপজাতি যুবককে চট্টগ্রামে পাঠায় সেনাবাহিনী ও বিজিবির সদস্যরা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ২৯ এপ্রিল রাঙামাটি জেলার সাজেক ইউনিয়নের জপুই এলাকাতে জুম চাষের সময় উঁচু পাহাড় থেকে দুর্ঘটনাবশত পড়ে গিয়ে নিচে থাকা বাঁশের আঘাতে মারাত্মকভাবে জখম হন যতীন ত্রিপুরা। স্থানটি অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় সেখানে চিকিৎসা সুবিধা খুবই অপ্রতুল। এ অবস্থায় আহত যতীন ত্রিপুরাকে কাছের জপুই বিওপিতে আনা হলে বিজিবি ক্যাম্প কর্তৃক তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু আঘাতের মাত্রা বিবেচনা করে জীবন রক্ষার্থে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে নেওয়া প্রয়োজন বলে বিজিবি কর্তৃক বিষয়টি খাগড়াছড়ি সেনা রিজিয়নকে জানানো হয়। এরপর খাগড়াছড়ি সেনা রিজিয়ন বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে ২৪ পদাতিক ডিভিশনকে (চট্টগ্রাম সেনানিবাস) জানিয়ে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে আনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানায়। বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনায় নিয়ে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল এসএম মতিউর রহমান তাকে দ্রুত হেলিকপ্টারের মাধ্যমে চট্টগ্রামে স্থানান্তর করার নির্দেশ দেন।

এরপর সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী জহুর ঘাঁটি’র একটি বিশেষ হেলিকপ্টারে করে যতীন ত্রিপুরাকে প্রথমে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নিয়ে আসা হয় এবং পরবর্তীতে সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

উল্লেখ্য, এর আগেও গত বছরের ২৯শে এপ্রিল সোমবার একই উপজেলার দুর্গম এলাকার এক প্রসূতি নারীকে হেলিকপ্টারে করে হাসপাতালে নিয়ে এসে নজির গড়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর এমন দায়িত্বশীলতায় বেঁচে গিয়েছে দুটি প্রাণ। রাঙামাটির জুরাছড়ি উপজেলার প্রত্যন্ত বগাখালী গ্রামের এক প্রসূতি নারী জিতনি তংচঙ্গ্যার (২৩) হঠাৎ প্রসব ব্যথা শুরু হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে স্থানীয়ভাবে ডাকা হয়েছিল ধাত্রী ও ওঝাকে। কিন্তু চারদিন ধরে ধাত্রী তার প্রসব করাতে ব্যর্থ হয়। এদিকে কাছাকাছি কোনো হাসপাতাল না থাকায় এক পর্যায়ে তাকে বাঁচানো অসম্ভব বলেই ধরে নিয়েছিল তার পরিবার। এভাবে চার দিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়েন তিনি। গ্রামটি এতটাই প্রত্যন্ত যে, তাকে হাসপাতালে নিতে হলে ঝিরি, নদী ও রাস্তা মিলিয়ে শহরে যেতে প্রায় ৭ দিন লেগে যেত। তাই কোনো উপায় না পেয়ে অবশেষে তাকে হেলিকপ্টারে করে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিয়ে প্রাণে বাঁচিয়েছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। এর আগে, বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে সোমবার সকালে জতনিকে বগাখালীর বিজিবির সীমান্ত চৌকিতে নিয়ে যান তার পরিবারের সদস্যরা। খবর পেয়ে সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি এই প্রসূতিকে হেলিকপ্টারে করে চট্টগ্রামে নিয়ে আসার নির্দেশ দেন। দুপুর ২টার দিকে হেলিকপ্টার সেনানিবাসে অবতরণের পর দ্রুত এ্যাম্বুলেন্সে করে জিতনিকে সিএমএইচে নেয়া হয়। এর আগে ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর একই গ্রাম থেকে সোনাপতি চাকমা নামে আরো এক প্রসূতিকে হেলিকপ্টারে সিএমএইচে এনে প্রাণ বাঁচায় সেনাবাহিনী।

এছাড়া রাঙ্গামাটি জেলার সাজেকের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় জুম চাষ শেষে বাড়ি ফেরার পথে গতবছর সাজেক ইউনিয়নের নিওথাংনাং পাড়ার অলীন্দ বিকাশ ত্রিপুরার ছেলে পণবিকাশ ত্রিপুরাকে (১৬) আক্রমণ করে একটি বন্য ভালুক। ক্ষতবিক্ষত হয় কিশোরের পুরো শরীর। ভালুকের থাবায় কয়েকটি দাঁতও পড়ে যায় তার। ২০১৯ সালের ১২ মে রবিবার বেলা সোয়া ২টায় আহত কিশোরকে নিয়ে রাঙামাটি থেকে আসা হেলিকপ্টারটি চট্টগ্রাম সেনানিবাসে অবতরণ করে। এসময় সেনাবাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তা ওই কিশোরকে হেলিকপ্টার থেকে নামিয়ে সিএমএইচের এ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেন।

অতি সম্প্রতি রাঙামাটির সাজেকের দুর্গম এলাকা লুংথিয়ান ত্রিপুরাপাড়ায় হামে আক্রান্ত মুমূর্ষু পাঁচ শিশুকে বাঁচিয়ে রাখতে চট্টগ্রাম থেকে সেনাবাহিনীর এক বিশেষ হেলিকপ্টার গিয়ে সেখান থেকে তাদের এনে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত ২৫শে মার্চ বুধবার দুপুরে তাদের রাঙামাটির সাজেকের দুর্গম শিয়ালদহ মৌজার লুংথিয়ান ত্রিপুরাপাড়া থেকে সেনাবাহিনীর বিশেষ হেলিকপ্টারে প্রথমে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে, পরে সেখান থেকে এ্যাম্বুলেন্সে করে চট্টগ্রাম মেডিকেলে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসা নিয়ে তারা সুস্থ হয়ে বাড়িও ফিরে যায়।

সূত্র মতে, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী অনেক মুমূর্ষু রোগীর প্রাণ বেঁচেছে সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীল ভূমিকার কারণে। এদের মধ্যে রয়েছে- পায়ে পচন ধরা বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা ফুটবল দলের সদস্য চাথুইমা মারমা, লক্ষ্মীছড়ি থানার পুলিশ কনস্টেবল মংজয় চাকমা প্রমুখ। গতবছর খাগড়াছড়ির দুরছড়ি এলাকায় ডায়রিয়া দেখা দিলে সেনা সদস্যরা মানবিক সহযোগিতা দিয়ে প্রায় ৩০টি পরিবারের সদস্যদের সুস্থ করে তোলে। এর পাশাপাশি সাজেকে মহামারি ডায়রিয়ার প্রকোপ দেখা দিলে সেখানেও মেডিকেল ক্যাম্প করে চিকিৎসা সেবা দিয়ে আক্রান্তদের সুস্থ করে তোলে সেনাবাহিনী।

শেয়ার করুন

About admin

01580-242555

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*