সর্বশেষ খবর
Home / খাগড়াছড়ি / গহীন পাহাড়ে সেনা পোশাক পরিহিত ইউপিডিএফ সন্ত্রাসী!!!
পাহাড়ী পথ

গহীন পাহাড়ে সেনা পোশাক পরিহিত ইউপিডিএফ সন্ত্রাসী!!!

এবার ২ পুলিশ পরিদর্শক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সামনে সামরিক পোশাক পরিহিত জুম্ম সন্ত্রাসী বাহিনী

 

 

এম.সাইফুল ইসলাম, খাগড়াছড়ি:

পার্বত্য চট্টগ্রামে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে কয়েক হাজার পাহাড়ি সন্ত্রাসী। এরা জেএসএস, ইউপিডিএফসহ পার্বত্য চট্টগ্রামভিত্তিক বিভিন্ন আঞ্চলিক দল ও গোষ্ঠীর সদস্য। এদের ভাণ্ডারে রয়েছে রয়েছে মারাত্মক অস্ত্র-শস্ত্র।

রয়েছে সামরিক পোশাকের আদলে কমব্যাট পোশাক, ওয়াকিটকিসহ নানা সরঞ্জাম। সামরিক কাঠামো তৈরি করে তিন পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছে সশস্ত্র সংগঠনগুলো।

তাদের রয়েছে নিজস্ব সেনাপ্রধান, আলাদা আলাদা কোম্পানি, বিভিন্ন উইং, শরীরে থাকে বাহিনীর পোশাক, হাতে অত্যাধুনিক ওয়াকিটকি, কাঁধে চকচকে ভারি ও দামি অস্ত্র। এরকম প্রায় কয়েক হাজার রয়েছে পার্বত্য জেলাগুলোতে। তারা প্রত্যেকেই প্রশিক্ষণ পাওয়া দক্ষ ও ক্ষিপ্র। ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ের দুর্গম অঞ্চলগুলোতে তাদের বিচরণ। শুধু পোশাক আর অস্ত্র নয় তাদের রয়েছে নিজস্ব পরিচয়পত্র, মুদ্রা ও পতাকা। পাহাড়ে জুম্মল্যান্ড ও স্বায়ত্তশাসিত সরকার গঠনকে টার্গেট করে নীরবে সশস্ত্র কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেছে এই সশস্ত্র সংগঠনগুলো।

একটি সরকারি গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ইউপিডিএফের সামরিক শাখার তিনটি কোম্পানি রয়েছে। এগুলো হচ্ছে, জাগুয়ার কোম্পানি (খাগড়াছড়ি), ড্রাগন কোম্পানি (রাঙ্গামাটি) ও ঈগল কোম্পানি (বাঘাইছড়ি)। এদের কাছে রকেট লঞ্চার, ১৪-এমএম, এম-১৬, এসকে-৩২, সেনেভা-৮১, এম-৪ ও এম-১-এর মতো ভয়াবহ অস্ত্রসহ প্রায় এক হাজার অত্যাধুনিক ও ভারী আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। তবে এদের কোনো স্থায়ী সামরিক ক্যাম্প নেই। সবগুলোই ভ্রাম্যমাণ।


সম্প্রতি ফেসবুক, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নিজেদের পতাকা, মুদ্রা ও পরিচয়পত্রের প্রচারণা চালাচ্ছে তারা। তিন পার্বত্য জেলা নিয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করছেন এমন গোয়েন্দা সদস্যরা এসব তথ্য জানান। তারা বলেন, পাহাড়কে অস্থিতিশীল করতে এসব সশস্ত্র সংগঠনগুলো সম্প্রতি তৎপর হয়েছে। সাধারণ উপজাতিদের বিভ্রান্ত করে আবার কখনও বলপ্রয়োগ করে নিজেদের দলকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করছে তারা।

এসব সশস্ত্র সংগঠনের তিনটি উইং খুবই শক্তিশালী। এগুলো হচ্ছে রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থ উইং। সম্প্রতি এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে পার্বত্যাঞ্চলে ৩টি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের (সদ্য ঘোষিত গনতান্ত্রিক বাদে) সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের একেক এলাকায় একেক দলের প্রভাব ও আধিপত্যের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।


এতে বলা হয়েছে, সমগ্র রাঙ্গামাটি জেলায়, খাগড়াছড়ি জেলার অল্প কিছু এলাকায় এবং বান্দরবানে জেএসএস (সন্তু) গ্রুপের মোটামুটি প্রভাব ও আধিপত্য রয়েছে বলে জানা যায়। অন্যদিকে ইউপিডিএফ-এর আধিপত্য রয়েছে সমগ্র খাগড়াছড়ি জেলা, রাঙ্গামাটির কোন কোন এলাকা ও বান্দরবানের অল্প পরিমাণ এলাকায়।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে জেএসএস (সংস্কার) এর মোটামুটি প্রভাব ও আধিপত্য থাকলেও রাঙ্গামাটিতে অল্প পরিমাণে প্রভাব রয়েছে বলে জানা যায়। সংশ্লিষ্টরা জানান, এই তিন সংগঠনের রয়েছে প্রায় ১৮শ’ সশস্ত্র সদস্য। তারা বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পোশাক ব্যবহার করে থাকে। এর মধ্যে জেএসএস (সন্তু) গ্রুপের রয়েছে ৮৭৫ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী।

তাদের অধীনে সামরিক কায়দায় ৬টি কোম্পানি রয়েছে। জেএসএস (সংস্কার) এর রয়েছে ২টি কোম্পানি। তাদের সশস্ত্র সন্ত্রাসীর সংখ্যা ২৫০ থেকে ২৬০ জন। অন্যদিকে ইউপিডিএফ এর ৪টি কোম্পানির অধীনে রয়েছে প্রায় ৭ শতাধিক সশস্ত্র সদস্য। ক্যাপ্টেন বা মেজর পদবির সদস্যরা কোম্পানিগুলোর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। গোয়েন্দারা জানান, দুই উপায়ে সশস্ত্র সদস্যরা তাদের দল ভারী করার চেষ্টা করেন।

প্রথমত, তারা পার্বত্য অঞ্চলে খোঁজ করেন কোন কোন উপজাতির নামে মামলা রয়েছে অথবা অপরাধের দায়ে কাদের পুলিশ খুঁজছে। তাদের তালিকা তৈরি করে নানা প্রলোভন দেখিয়ে দলে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করে। আবার কিছু উপজাতিকে স্বাধীন পার্বত্য অঞ্চল অথবা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গড়ে তোলার অনুপ্রেরণা জুগিয়ে প্রশিক্ষণসহ হাতে অস্ত্র তুলে দেয়। এসব সশস্ত্র সংগঠনের সদস্যরা আবার দল থেকে মাসিক হারে নিয়মিত বেতনও পান।


এসব কথা শুধু অনলাইন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা লোকমুখে শোনা হলেও অনেকেই ভাবতেন আসলে একটা স্বাধীন দেশে সরকারী সেনাবাহিনী ছাড়াও আরেকটি সন্ত্রাসী সেনাবাহিনী হয় নাকি???

আসলে বিষয়টা সত্যিই অবিশ্বাস্য ছিলো। কিন্তু এবার খাগড়াছড়ি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহাদাত হোসেন টিটু, মহালছড়ি সদর থানার (ওসি) মো: নুরে আলম ফকির, খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোঃ নাজমুস শোয়েবসহ অন্যান্য সিভিল প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিজ চোখেই দেখেছেন জুম্ম সেনাসদস্যদের।

গত ১১ তারিখ খাগড়াছড়ি সদরের দেবতাপুকুর এলাকায় পরিত্যক্ত সেনাক্যাম্পের সরকারী খাস ভূমিতে নির্মিত লক্ষী নারায়ন মন্দিরটি অন্যত্র সরিয়ে নিতে এলাকাবাসীর সাথে আলোচনা করতে গেলে সেখানে টিলার উপর উঠা মাত্রই সেনাবাহিনীর কমব্যাট পোশাক পরিহিত সশস্ত্র একদল সন্ত্রাসীকে দেখতে পান তারা ।

এসময় পাশে টহলরত মহালছড়ি জোনের সেনা সদস্যদের দেখে দ্রুত জঙ্গলের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে তারা।

ঘটনার সত্যতা জানতে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোঃ নাজমুস শোয়েব প্রতিবেদককে বলেন, ২ থানার ২ ওসি সাহেবরা সহ আমরা দেবতাপুকুর এরাকায় নির্মিত মন্দিরের নিকটে পৌঁছালে সেনা পোশাক পরিহিত সশস্ত্র মোটামুটি ১৫-২০ জনের মতো সন্ত্রাসীকে দেখতে পাই , এসময় সেনাবাহিনী দেখে তারা দ্রæত সড়কে যায়, তবে তাৎক্ষনিক তাদের অবস্থান নিশ্চিতের পর মহালছড়ি জোনের সেনা সদসরা অপারেশন পরিচালনা করলে সন্ত্রাসীরা গহীন অরন্যে পালিয়ে যায়।

সেদিন সেখানে উপস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সদর থানার এক এসআই জানান, আমার জীবনে বহুবার জুম্ম সেনাবাহিনীর নাম শুনেছি তবে সেদিনই প্রথম দেখেছি। একটা স্বাধীন দেশে কিভাবে তারা প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা করে তা আমার বোদগম্য নয়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে আনুষ্ঠানিকভাবে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে গেরিলা নেতা সন্তু লারমার নেতৃত্বে অস্ত্র সমর্পণ করে জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র শাখা শান্তি বাহিনীর সদস্যরা। আর ওইদিনই প্রসীত বিকাশ খীসা ও রবি শংকর চাকমার নেতৃত্বে খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে শত শত কালো পতাকা উত্তোলন করে অস্ত্র সমর্পণ অনুষ্ঠানকে ধিক্কার জানায় সন্ত্রাসীরা।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, শান্তি বাহিনীর অস্ত্র আত্মসমর্পণের দৃশ্যটি ছিল মূলত লোক দেখানো। তারা ওইদিন মাত্র ১০ শতাংশ অস্ত্র জমা দিয়েছিল যার অধিকাংশই ছিল জরাজীর্ণ ও ভাঙাচোরা।

বাকি ৯০ শতাংশ অস্ত্রই তারা নিজেদের গোপন আস্তানায় মজুদ করে রেখেছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে তারা ওইসব অস্ত্র পাহাড়ে আধিপত্য বিস্তারের কাজে ব্যবহার করেছে।

সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএসের সাথে শান্তি চুক্তি হলেও বর্তমানে আধিপত্য বিস্তারের জেরে একটি সংগঠন থেকে চারটি সংগঠন সৃষ্টি হয়েছে। সর্বপ্রথম ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর ঢাকায় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে প্রসীত বিকাশ খীসা ও রবি শংকর চাকমার নেতৃত্বে ১১ সদস্যের ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) গঠিত হয়। পাহাড়ে নতুন করে শুরু হয় সন্তু ও প্রসীতের নেতৃত্বে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। এসময় থেকেই পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপক চাঁদাবাজি, হত্যা ও অপহরণের পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে মাঝে মধ্যে বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হতে থাকে তারা। এতে প্রাণ হারায় বহু নেতাকর্মী।

কিন্তু প্রতিষ্ঠার ১৮ বছরের মাথায় ইউপিডিএফ ভেঙে যায়। গত বছরের ১৫ নভেম্বর প্রসীত-রবি’র নেতৃত্ব প্রত্যাখ্যান করে বেরিয়ে এসে তপন জ্যোতি বর্মাকে আহ্বায়ক ও জলেয়া চাকমা তরুকে সদস্য সচিব করে গঠিত হয় ১১ সদস্যের ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) দল। আধিপত্য বিস্তারের জের ধরে গত কিছুদিন আগে তপন চাকমাসহ ৬ জনকে গুলি করে হত্যা করে প্রতিপক্ষ। ক্ষমতার দ্বন্ধে পাহাড়ি সংগঠনগুলোর অনেক নেতাকে প্রাণ হারাতে হয়েছে। অনেক নেতা বিদেশে আত্মগোপন করে রয়েছেন।

কিছুদিন পূর্বে পার্বত্য জেলায় সশস্ত্র সংগঠনগুলোর এ ধরনের তৎপরতা প্রসঙ্গে খাগড়াছড়ির জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী বলেন, একটি সশস্ত্র গ্রুপ তিন পার্বত্য জেলাকে নিয়ে জুম্মল্যান্ড গঠন করতে চায় তবে তারা সংখ্যায় খুবই কম। ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি হয়েছে। শান্তিচুক্তি কি আবারও হবে? হবে না। বরং শান্তি চুক্তি যেটা হয়েছে সেটাই হচ্ছে আমাদের অধিকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ নিয়ে নিরন্তর কাজ করছেন।

তিনি বলেন, যারা এসব করছে তারা দেশদ্রোহী কাজ করছে। এসব সরকার ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়। তবে সন্ত্রাসী সন্ত্রাসী-ই। তাদের আলাদা কোনো পরিচয় নেই।

একই প্রসঙ্গে খাগড়াছড়ির তৎকালীন জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ ওয়াহেদুজ্জামান বলেন, সশস্ত্র সংগঠনগুলো স্বাধীনতা চাচ্ছে কিনা আমার জানা নেই। তবে তারা ভূমি, বন ও পুলিশি ক্ষমতা পেতে চায়। আমি মনে করি এর অর্থ হলো সার্বভৌমত্ব চাওয়া। রাষ্ট্রের কোনো সম্পত্তি আঞ্চলিক পর্যায়ে দেয়া উচিত নয়। জেলা প্রশাসক বলেন, পার্বত্য জেলার মূল সমস্যা হলো ভূমি। এখনও এটা জরিপ করা হয়নি। যার কারণে নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে চিঠি দিয়ে এরই মধ্যে পার্বত্য মন্ত্রণালয় থেকে ভর্ৎসনা পেয়েছি

এ প্রসঙ্গে সাবেক খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মজিদ আলী বলেন, যারা আলাদা পতাকা, মুদ্রা ও পরিচয়পত্র নিয়ে তৎপরতা চালাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফ-এর নামে এসব করা হচ্ছে। তাদের ওপর পুলিশের নজরদারি রয়েছে।

About admin

01580-242555

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*