সর্বশেষ খবর
Home / খাগড়াছড়ি / মূর্তি চুরির অপবাদ, নিজ দেশে পরবাসী সেনাবাহিনী

মূর্তি চুরির অপবাদ, নিজ দেশে পরবাসী সেনাবাহিনী

 

এম.সাইফুল ইসলাম, খাগড়াছড়ি:

“চোরের মায়ের বড় গলা” কথাটি আসলে আমরা হরহামেশাই বিভিন্ন স্থানে ব্যবহার করে থাকি। তবে সব জায়গাতেই কথাটির একটি ভাবার্থই বোঝায়। পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবানে কথাটির সঠিক প্রয়োগের একমাত্র বিশ্বস্ত স্থান এখানকার উপজাতীয় সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর কুট বুদ্ধিওয়ালা মাথা।

পাহাড়ে শান্তিচুক্তির পর দেশের সবকটি সরকারই পাহাড়বাসীর জন্য প্রায় সর্বোচ্চ ছাড় দিয়েছে, দিয়েছে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা। এখানকার পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর সুবিধার্থে পাহাড়ে সিভিল প্রশাসনের পাশাপাশি কাজ করে যাচ্ছে দেশের মুকুট বাংলাদেশ সেনাবহিনীও। প্রতিমাসে শান্ত-করণ কর্মসূচীর আওতায় এখানকার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নানা ধরণের সহডোগিতা দিয়ে আসছে সেনাবাহিনী ও বিজিবির জোন সদরগুলো। সেনাসদস্যদের নিজেদের বেতনের অংশ থেকে একটা নির্দিষ্ট অংশ হারে কেটে রেখেও এখানকার জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে ব্যায় করা হয়।

এছাড়াও বিনামূল্য চিকিৎসা সেবা, বাড়ি-ঘর নির্মান, নগদ সহায়তা, ব্রীজ-কালভার্ট নির্মান, মসজিদ-মন্দির-কিয়াং নির্মান সহ হাজারো কর্মকান্ডের একক অংশীদার সেনাবাহিনী কিন্তু এরপরেও একটু সুযোগ পেলেই যেন সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে দাড়িয়ে যাওয়া এখানকার পাহাড়ী জনগোষ্টীর স্বভাবে পরিনত হয়েছে। এ যেন অকৃতজ্ঞ জাতি।


এদিকে গত মাসে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের প্রবারণা পূর্নিমার ঠিক আগের রাতে গত ২২ অক্টোবর সোমবার দিবাগত রাতে আনুমানিক ১ টার দিকে সেনাপোশাক পরিহিত একদল ইউপিডিএফ সন্ত্রাসী খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার গুইমারা উপজেলার ২ নং হাফছড়ি ইউনিয়নের কুকিছড়ায় পরিত্যাক্ত সেনাক্যাম্পের সরকারী খাসভূমি দখল কওে অবৈধভাবে নির্মিত বৌদ্ধ মন্দিরে প্রবেশ করে সেখানে ব্যাপক ভাংচুর চালায় এবং হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলে যায়, কেউ এবিষয়ে কিছু জানতে চাইলে সেনাবাহিনীর নাম বলতে হবে, ভূলেও কেউ তাদের কথার বাহিরে গেলে গুলি করে মারা হবে।

জানা গেছে, এর কিছুদিন আগে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার গুইমারা উপজেলায় ধর্মীয় উপাসনালয় (বৌদ্ধ মন্দির) তৈরি করার নামে সেনাবাহিনীর একটি পরিত্যক্ত ক্যাম্পের সরকারী খাস ভূমি দখলের অভিযোগ উঠেছিলো।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গুইমারা উপজেলার ২ নং হাফছড়ি ইউনিয়নের কুকিছড়ায় পরিত্যাক্ত সেনাক্যাম্পের সরকারী খাসভূমি দখল করে ধর্মীয় উপসনালয় তৈরীর নামে এক রাতের ব্যবধানে একটি ঘর তৈরী করে তাতে মন্দিরের অবয়ব বসিয়ে উক্ত ভূমিটি দখল করেছিলো কতিপয় সন্ত্রাসীরা।

এ ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনীর একটি নিয়মিত টহল দল স্থানীয় কার্বারীসহ জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে বিহার নির্মানকারী উপজাতীয়দের কাছে খাস ভূমিতে তড়িঘড়ি করে ঘর নির্মানের কারণ জানতে চাইলে তারা নিরাপত্তাবাহিনীর কাছে উক্ত ভূমি তাদের ব্যক্তি মালিকানাধীন বলে দাবি করেন।


তাৎক্ষনিক নিরাপত্তাবাহিনী যথাযথ কর্তৃপক্ষ কিংবা ভূমির মালিকের অনুমতি নিয়ে ঐ দলটিকে ঘর নির্মান করার অনুরোধ করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে স্থানীয় উপজাতিরা বিভিন্ন ভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে নিরাপত্তাবাহিনীকে নিয়ে নানা রকম মিথ্যা ও উস্কানীমূলক অপপ্রচার চালিয়েছিলো।

সোমবার (২৬ জুন) প্রতিবেদক কর্র্র্তৃক সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কুকিছড়ায় পরিত্যক্ত সেনাক্যাম্পের স্থানে কতিপয় উপজাতীয় কর্তৃক ভূমি দখল করে একরাতের দিনের মধ্যে নির্মানের নিমিত্তে একটি কাঠের ঘরের অবকাঠামো দাড় করায়। এখানে উল্লেখ্য যে, নির্মিতব্য বৌদ্ধ বিহারটির প্রায় ৩০০ গজের ভেতর আরো ২ টি বিহার থাকলেও কেন বা কি কারণে উপজাতীয়রা আরেকটি বিহার নির্মানের নামে সরকারী ভূমি দখল করতে চাইছে এ নিয়ে প্রশ্ন জেগেছে স্থানীয়দের মনে। তাদের দাবি পাহাড়ের আঞ্চলিক একটি সশস্ত্র সংগঠন সাধারণ উপজাতীদের আড়ালে থেকে সরকারী এ খাস ভূমিটি দখলের পায়ঁতারা করছে।

এসময় স্থানীয় কার্বারী এচিং মারমা জানান, যেখানে কুকিছড়ায় আরো দুটি বৌদ্ধ বিহার রয়েছে সেখানে কতিপয় ভূমিদস্যুরা বিহারের নামে এ ভূমিটি দখলের পায়তারা করছে। এটি মূলত সরকারী খাস ভূমি।
তখন এ বিষয়ে ২ নং হাফছড়ি ইউপি’র চেয়ারম্যান চাইথোয়াই মারমা জানান, কুকিছড়ায় সরকারী খাস ভূমি দখল করে স্থানীয় কিছু লোকজন একটি বিহার নির্মান করছিলো, পরে ইউএনও স্যারসহ সেখানে গিয়ে কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

গুইমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (অ.দা) বিভিষন কান্তি দাস এই প্রতিবেদককে তখন জানিয়েছিলেন, কুকিছড়ায় সরকারী একটি খাস ভূমিতে অবৈধভাবে উপজাতীয়রা বৌদ্ধ বিহার নির্মান করছে খবর পেয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানসহ ঘটনাস্থলে গিয়ে আমরা বিহার নির্মানে স্থগিতাদেশ দিয়েছি, মূলত ঐ ভূমিটি সরকারী খাস ভূমি, এছাড়া আপাতত বিহার নির্মানের কাজ বন্ধ রয়েছে। এখানে আগে সেনাবাহিনীর পরিত্যক্ত ক্যাম্প ছিল।

কিন্তু সরকারী আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তখন বিহারটি নির্মান করে খাস ভূমিটি দখলে নিয়েছিলো সন্ত্রাসীরা। এরপর সেখানে এই প্রতিবেদক সহ স্থানীয় সাংবাদিকরা সংবাদ সংগ্রহে গেলে মন্দিরের দেখ-ভালকারীরা রহস্যজনক কারণে তাদের মন্দিরের প্রাঙ্গনে প্রবেশ করতে দেয়নি।
তখন সেনাবাহিনীকে নিয়ে অপপ্রচারে ব্যর্থ হয়ে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে আঞ্চলিক সন্ত্রাসীরা, সুযোগ খুঁজতে থাকে, কিভাবে পাহাড়ের শান্ত পরিবেশ অশান্ত করা যায়, যার ধারাবাহিতকায় বর্তমানে আবারো সেনাবাহিনীকে টার্গেট করে অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে তারা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সত্যতা নিশ্চিত করতে এই প্রতিবেদক কথা বলেন স্থানীয় কার্বারী এচিং মারমার সাথে, তিনি জানান, গতরাতে এই এলাকায় সেনাবাহিনীর টহল টিম এসেছে বলে আমার জানা নেই তবে রাতে মন্দিরের আশে-পাশে স্থানীয়দের হট্টগোল শোনা গেছে।

এরপর পরদিন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা গুইমারা বাজারো বিক্ষোভ মিছিল করে এবং সেনা রিজিয়ন অভিমুখে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের আটকে দেয়। এসময় তারা ব্যাপক সেনা বিরোধী ¯েøাগান দেয়। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসে তাদের, অপরাধীদের বিচার ও মন্দির পুনঃনির্মানের আশ্বাস দিলে তারা শান্ত হয়।

এরপর রিজিয়ন কমান্ডার, ডিসি, এসপিসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা গুইমারার চাইন্দামুনি বিহারে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মতবিনিময় কালেও ইউপিডিএফ আবারো গুইমারা বাজারো বিশৃ্কংলার চেষ্টা করে। ।

সেদিন কুকিছড়ায় পূর্বপরিকল্পিত পরিকল্পনায় সফল হয়েছিলো ইউপিডিএফ। অবৈধভাবে দখলকৃত মন্দিরের ভ’মিটি রেজিষ্ট্রি করে, মন্দিরের চারপাশে সিকিউরিটি ওয়াল নির্মান. নলকূপ স্থাপন, পুনরায় মুর্তি স্থাপনকরে মন্দির চালুর সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন কওে দিয়েচিলো জেলা প্রশাসক।

যার ধারাবাহিকতায় এরপর ইউপিডিএফ হাত দেয় জেলার সদর উপজেলায়। সদরের দেবতাপুকুরন্থ নুনছড়িতে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড কতৃক কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত একটি মন্দির থাকলেও নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে তারা পাশ্বস্ত টিলার ওপরে পরিত্যক্ত একটি সেনাকাম্পের খাস ভূমি দখল করে সেখানে লক্ষী নারায়ন মন্দির নির্মানের নামে একটি ঘর নির্মান করে। পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিত্যাক্ত সেনাক্যাম্প ও বাঙালীদের ভূমি অবৈধ দখলে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা ধর্মীয় স্থাপনা তৈরিকে হাতিয়ার হিসাবে গ্রহণ করেছে এবং তারা জানে এবিষয়ে সেনাবাহিনী বাধাঁ দিতে আসবেই আর তখনি পাহাড় হতে সেনাবাহিনী উচ্ছেদে অপপ্রচারের আরেকটা সুযোগ তারা পাবে, সুতরাং, এক ঢিলে দুই পাখি শিকার।

এরপর মহালছড়ি জোন কতৃক অবৈধভাবে নির্মিত মন্দিরটি অন্যত্র সরিয়ে নিতে বারংবার তাগাদা ও আর্থিক সহায়তা দিলেও সাধারণ উপজাতীয়রা সেনাবাহীনির কাছে সম্মত হয়ে পরে আবার অদৃশ্য হাতের ইশারায় মত পাল্টে দিয়ে সেনাদের বিরুদ্ধেই অপপ্রচার চালায়।

পর্যায়ক্রমে ইউএনও থেকে ডিসি পর্যন্ত বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে গিয়ে হিমশিম খায় । পরিশেষ স্থানীয়রা ডিসি অফিসে মন্দিরটি অন্যত্র সরিয়ে নেবার বিষয়ে অঙ্গীকার করলেও এলাকায় ফিরে তারা অবারো মন্দিরটি সংস্কার করে সেখানে পূজা করতে শুরু করে।

একটি বিষয় এখানে বলে রাখা দরকার, নির্মানের পর থেকে কথিত মন্দিরটিতে কোন মূর্তি ছিলোনা যা প্রতিবেদক, ইউএনও কিংবা প্রশাসনের কারোরই নজরে পড়েনি কিন্তু গুইমারার কুকিছড়ার ঘটনাটির আদলে এবার সন্ত্রাসীরা মহালছড়িতেও আরেকটি অপরাজনীতি করতে চায়।

এরই ধারাবাহিকতয়, এবার তারা মুখে ফেনা তুলেছে যে, সেনাবাহিনী তাদের মন্দিরের মূর্তি চুরি করেছে, ভাংচুর চালিয়েছে। তাদেও ভাষ্যমতে গত সোমবার (১২ নভেম্বর ২০১৮) মহালছড়ি জোন কমাণ্ডারের নির্দেশে একদল সেনাসদস্য নুনছড়ির দেবতাপুকুর লক্ষী নারায়ন মন্দিরে যায়। সে সময় মন্দিরে লোকজন না থাকার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সেনা সদস্যরা মন্দির ভাঙচুর করে মন্দিরে অবস্থিত মুর্তি, বাদ্যযন্ত্র চুরি করে নিয়ে যায়। একই সাথে মহোৎসবের জন্য এলাকাবাসীর কাছ থেকে উত্তোলিত সকল জিনিসপত্রাদি (চাল, আলু, ডাল, বিস্কুট এবং বিভিন্ন ধরনের কোমল পানীয়) নষ্ট করে দেয়।

হাস্যকর বিষয় হলো এ ঘটনা যদি কোন দুধের শিশুও শুনে তবে সেও হাসবে। কারণ ইতিপূর্বে কুকিছড়ায় এমনই ধোঁয়া তুলে অবৈধভাবে নির্মিত মন্দিরের ভূমিটি নিজেদের করে নিতে সফল হয়েছিলো তারা। আর যেখানে কোন মূর্তি ছিলোইনা সেখানে মূর্তি চুরি???

এবিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোঃ নাজমুস শোয়েব বলেন, এরকম কোন ঘটনা আমার জানা নেই, তাছাড়া মন্দিরটির ভেতরে কোন মূর্তিও আমার নজরে পড়েনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিনাচাঁন ত্রিপুরা জানান, মন্দিরটিতে কোন ধরনের মূর্তি ছিলোনা, সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে একটা মহল মিথ্যাচার করছে।

স্থানীয়দের দাবি একটা বিশেষ মহল সাধারণ উপজাতীয়দের জিম্মি করে তাদের সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বাধ্য করছে।

তবে এটা সহজেই অনুমেয় যে, সেনাবাহিনীকে মূর্তি চোর বানানোর মধ্য নিয়ে মন্দিরের স্থানটিকে পাকাপোক্তভাবে নিজেদের করে নিতে চাইছে সন্ত্রাসীরা।

About admin

01580-242555

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*